হেঁটে বিশ্বভ্রমণ শেষে ২৮ বছর পর বাড়ি ফিরলেন ব্রিটিশ নাগরিক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত নভেম্বর ৩, ২০২৬, ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ
হেঁটে বিশ্বভ্রমণ শেষে ২৮ বছর পর বাড়ি ফিরলেন ব্রিটিশ নাগরিক

প্রায় ২৮ বছর ধরে হেঁটে বিশ্বভ্রমণ শেষে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন ব্রিটিশ ভ্রমণকারী কার্ল বুশবি। ১৯৯৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলি থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ ৩১ হাজার মাইল বা প্রায় ৫০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সোমবার (২ নভেম্বর) ইংল্যান্ডের হাল শহরে নিজের শৈশবের বাড়িতে পৌঁছান ৫৭ বছর বয়সী এই অভিযাত্রী।

দীর্ঘ এই যাত্রায় মধ্য আমেরিকার জঙ্গল পাড়ি দিয়েছেন বুশবি। আলাস্কা থেকে রাশিয়ার মধ্যবর্তী বরফে ঢাকা পথ হেঁটে পার হয়েছেন। যাত্রার শেষ দিকে গত মাসে সাঁতরে ইংলিশ চ্যানেলও পাড়ি দেন তিনি। পুরো অভিযানে কোনো যানবাহন ব্যবহার করেননি। নিজের শক্তি ও সামর্থ্যের ওপর ভর করেই এগিয়েছেন। সোমবার সকালে নিজ শহর হালের একটি চত্বরে তাঁকে স্বাগত জানাতে জড়ো হন শত শত মানুষ। তাঁদের উদ্দেশে বুশবি বলেন, ‘২৮ বছর পর এর চেয়ে বেশি কিছু আর চাওয়ার থাকতে পারে না।’

এরপর নিজের কিছু জিনিসপত্র একটি ট্রলিতে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হন তিনি। ট্রলির ওপরে ছিল একটি অতিরিক্ত চাকা, যা আর কখনোই তাঁর প্রয়োজন হবে না। বিদায় জানানোর সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, আবারও আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে।’ বাড়িতে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন মা, ৩৬ বছর বয়সী ছেলে এবং ১২ বছর বয়সী নাতনি।

বিশের দশকে বুশবি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্যারাস্যুট রেজিমেন্টে কাজ করতেন। বিবাহবিচ্ছেদের পর বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনা করেন তিনি। তাঁর বাবা একসময় জানতে চেয়েছিলেন, লন্ডন থেকে হেঁটে নিউইয়র্কে যাওয়া সম্ভব কি না। বাবার সেই ভাবনা থেকেই অনুপ্রাণিত হন বুশবি।

১৯৯৮ সালে একটি তাঁবু, কয়েকশ ডলার এবং একটি সস্তা প্লাস্টিকের ক্যামেরা নিয়ে চিলি থেকে যাত্রা শুরু করেন তিনি। এরপর আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশ পেরিয়ে উত্তর দিকে এগিয়ে যান। আলাস্কা থেকে রাশিয়ায় প্রবেশের পর মঙ্গোলিয়া ও চীন হয়ে ক্যাস্পিয়ান সাগর সাঁতরে ইউরোপে পৌঁছান।

গত বছর দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা জানিয়ে বুশবি বলেছিলেন, ‘কখনো কখনো একই পথে চলতে চলতে খুব একঘেয়ে লাগে। মরুভূমিতে দিনের পর দিন, এমনকি সপ্তাহের পর সপ্তাহ একই রকম দৃশ্য দেখতে হয়। এতে মানসিকভাবে অস্থির লাগতে পারে। আর্কটিক অঞ্চলেও একই অভিজ্ঞতা হয়েছে।’

শুরুতে বুশবির ধারণা ছিল, এই অভিযান শেষ করতে প্রায় ১০ বছর লাগবে। কিন্তু পথে নানা বাধার কারণে সময় লেগেছে প্রায় তিন দশক। পানামায় কিছু সময় কারাগারে থাকতে হয়েছে তাঁকে। মেক্সিকোয় বন্দুকের মুখেও পড়েছেন। অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার অভিযোগে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটক করেছিল। এ ছাড়া ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ও করোনা মহামারির কারণেও তাঁর যাত্রা পিছিয়ে যায়।

বুশবি বলেছেন, ‘একবিংশ শতাব্দীতে দীর্ঘ অভিযাত্রা দেখতে এমনই। এর অর্ধেক সময়ই পরিবেশগত বাধার পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক ও ভূরাজনৈতিক জটিলতা সামলাতে ব্যয় হয়। কখনো কখনো অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো সমাধান থাকে না।’ তিনি জানিয়েছেন, ২৮ বছরের মধ্যে মাত্র প্রায় ১৫ বছর তিনি হেঁটেছেন। ভিসা, যাত্রার পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থা করতে তাঁকে কয়েকবার মেক্সিকোয় ফিরে যেতে হয়েছে।

বুশবির এই বিশ্বভ্রমণ নিয়ে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি আগামী কয়েক সপ্তাহে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে বক্তব্য দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।