যে পরমাণু অস্ত্র তৈরির আশঙ্কায় ইরানে একের পর এক হামলা, শেষ পর্যন্ত সেই অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নিতেই কি দেশটিকে বাধ্য করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল? সামরিক হামলায় ধ্বংস হচ্ছে বহু স্থাপনা, বাড়ছে চাপও; কিন্তু তাতেও যদি তেহরানকে থামানো না যায়, তাহলে পরিণতি কী হবে? বরং ভবিষ্যতে আবারও হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যদি ইরান পারমাণবিক অস্ত্রকে একমাত্র নিরাপত্তার ঢাল মনে করে? তাহলে যে অস্ত্র তৈরির আশঙ্কা ঠেকাতে এত আয়োজন, শেষ পর্যন্ত সেই পথই কি আরও সহজ করছে ওয়াশিংটন?
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন এমনই এক কঠিন হিসাব। দ্য আটলান্টিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে ধারণা তৈরি হয়েছে, অর্থনৈতিক চাপে দুর্বল হয়ে পড়েছে ইরান। আরেক দফা হামলা চালানো গেলে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে হামলা শুরুর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
কিন্তু সামরিকভাবে কোনো দেশকে দুর্বল করা আর তাকে রাজনৈতিকভাবে নিজের শর্ত মানতে বাধ্য করা এক বিষয় নয়। ইরানের স্থাপনা ধ্বংস হলেও দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে কিংবা তেহরান ওয়াশিংটনের দাবি মেনে নেবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অভিযানেও এই সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। হামলায় ইরানের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু দেশটির ভবিষ্যৎ এখনো পুরোপুরি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
এদিকে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে রাশিয়ার ভূমিকা। রোসাটম জানিয়েছে, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে শিগগিরই ৫০৮ জন রুশ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ পাঠানো হবে। সেখানে বর্তমানে কাজ করছেন ১৯২ জন রুশ বিশেষজ্ঞ। এর অর্থ এত হামলার পরও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এবং অবাধে এসব স্থাপনায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
তবে বারবার হামলা ও অনিশ্চিত যুদ্ধবিরতি তেহরানের নিরাপত্তা ভাবনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ইরানের কিছু কট্টরপন্থী রাজনীতিক, সংসদ সদস্য ও বিশ্লেষক ইতোমধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের বিরোধিতা থেকে সরে আসা এবং পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন। যদিও এটি এখনো সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
এখানেই সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা। ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ধ্বংস করতে গিয়ে যদি দেশটির ভেতরেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি আরও জোরালো হয়, তাহলে সামরিক বিজয়ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের কৌশলগত পরাজয়ে পরিণত হতে পারে।
সব মিলিয়ে তেহরানের শত্রুদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—ইরানের বিরুদ্ধে তৃতীয় দফা হামলা কি দেশটিকে শেষ পর্যন্ত দমিয়ে রাখবে, নাকি উল্টো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেবে? যে হুমকি নির্মূল করতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ করছে, সেই হুমকিই যদি আরও বড় হয়ে ফিরে আসে, তাহলে এই যুদ্ধের সাফল্য কোথায়? এর প্রভাব শুধু ইরানের পরমাণু কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বদলে যেতে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সমীকরণও।