তুরস্ক বলতেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে ইস্তাম্বুলের ব্যস্ত শহর, ভূমধ্যসাগরের সৈকত কিংবা বিলাসবহুল রিসোর্ট। কিন্তু এসবের বাইরেও দেশটিতে রয়েছে এমন কিছু জায়গা, যা দেখলে অবাক হতে হয়। এর মধ্যে এমন একটি লেক রয়েছে যা দেখতে অনেকটা মালদ্বীপের সৈকতের মতো।
এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশের সংযোগস্থল তুরস্কের কোথাও মাটির ৪০ মিটার নিচে রয়েছে প্রাচীন শহর। কোথাও পাথরের গায়ে খোদাই করা হয়েছে ৮৩ দেবতার ছবি। আবার কোথাও পানির নিচে পাওয়া গেছে পৃথিবীর প্রাচীন জীবনের চিহ্ন। এমনকি তুরস্কে এমন পাহাড়ও আছে, যার চূড়ায় বিশাল বিশাল পাথরের মূর্তি সাজানো।
ভিন্নধর্মী এসব জায়গার মধ্যে পাঁচটি পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণীয়।
তুরস্কের বুরদুর প্রদেশে রয়েছে সালদা হ্রদ। প্রথমবার দেখলে মনে হতে পারে, এটি হয়তো মালদ্বীপের কোনো সৈকত।
হ্রদের তীর সাদা। পানির রং নীল। এই অদ্ভুত সৌন্দর্যের কারণ হাইড্রোম্যাগনেসাইটের সমৃদ্ধ খনিজ স্তর। কোথাও কোথাও হ্রদটির গভীরতা প্রায় ২০০ মিটার।
হ্রদের পাশে ঘোরাঘুরি, পিকনিক ও সাঁতার কাটার পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকায় হাঁটার সুযোগও রয়েছে। তবে জায়গাটির সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় লুকিয়ে আছে পানির নিচে।
এখানে পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবনের কিছু চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব প্রাচীন জীবাশ্ম নাসার বিজ্ঞানীদের মঙ্গলগ্রহে পাঠানো ২০২০ সালের অভিযানের প্রস্তুতিতেও কাজে লেগেছিল।
ক্যাপাডোসিয়ার মাটির নিচের শহর
তুরস্কের ক্যাপাডোসিয়া অঞ্চলের মাটির নিচে রয়েছে কায়মাকলি নামে একটি প্রাচীন শহর। নরম আগ্নেয় পাথরের নিচে তৈরি এই শহরে রয়েছে শতাধিক সুড়ঙ্গ।
সুড়ঙ্গগুলো প্রায় ৪০ মিটার গভীর পর্যন্ত নেমে গেছে। একসময় আরব-বাইজেন্টাইন যুদ্ধের সময় খ্রিস্টানরা এখানে আশ্রয় নিতেন।
ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে ফ্রিজীয়রা এসব গুহা তৈরি করেছিল। পরে সেখানে ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, গির্জা, আস্তাবল এবং ধাতু তৈরির কারখানাও তৈরি হয়।
শহরটির মোট আটটি তলা রয়েছে। এর চারটি তলা পর্যটকদের জন্য খোলা। পুরো শহরে একসময় প্রায় ২০ হাজার মানুষ থাকতে পারত বলে ধারণা করা হয়।
ইয়াজিলিকায়ার পাথরে ৮৩ দেবতার ছবি
তুরস্কে হাজার হাজার প্রাচীন পাথরের ধর্মীয় স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে ইয়াজিলিকায়া সবচেয়ে বড় খোলা জায়গার হিট্টাইট ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর একটি।
খ্রিস্টপূর্ব ১৩ শতকে এটি তৈরি করা হয়। এখানে বিশাল পাথরের গায়ে ৮৩ দেবতার ছবি খোদাই করা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দানব ও রাজাদের ছবিও দেখা যায়।
দুপুরের দিকে সূর্যের আলোয় এসব পাথরের খোদাই সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। ইয়াজিলিকায়ার কাছেই রয়েছে হিট্টাইটদের প্রাচীন রাজধানী হাত্তুসা। দুটি স্থানই ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় রয়েছে।
পাহাড়ের চূড়ায় বিশাল পাথরের মূর্তি
তুরস্কের আনাতোলিয়া অঞ্চলের নেমরুত পাহাড়ও পর্যটকদের জন্য বিস্ময়ের জায়গা। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে এই পাহাড়ের চূড়ায় একটি সমাধি স্থাপন করা হয়।
এটি তৈরি করেছিলেন কমাজেন রাজ্যের রাজা প্রথম অ্যান্টিওকাস থিওস। পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে বিশাল পাথরের মূর্তি, স্তম্ভ ও বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন।
মূর্তিগুলোর উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার। দেবতা ও রাজাদের এসব মূর্তির মাথা এখন মাটিতে পড়ে রয়েছে। পাহাড়ের চূড়ার বিশাল পাথরের মূর্তিগুলো পুরো জায়গাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
আড়াই হাজার বছর ধরে জ্বলছে পাথরের আগুন
তুরস্কের অলিম্পোসের কাছে রয়েছে ইয়ানারতাশ। আনতালিয়ার প্রায় ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এই এলাকায় পাথরের ফাঁক দিয়ে ছোট ছোট আগুন জ্বলতে দেখা যায়।
প্রায় ৫ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এসব আগুন। আগুনের তীব্রতা ও অবস্থান ঋতুভেদে কিছুটা পরিবর্তিত হয়।
পাথরের নিচ থেকে বের হওয়া মিথেনসহ কিছু রাসায়নিক উপাদানের প্রতিক্রিয়ায় এই আগুন তৈরি হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে এখানে আগুন জ্বলছে বলে ধারণা করা হয়।
রাতের অন্ধকারে পাথরের ফাঁক থেকে বের হওয়া এসব আগুন পুরো এলাকাকে এক রহস্যময় দৃশ্যে পরিণত করে।