‘আমি বারবার প্রমাণ করেছি, বোকামিও করতে পারি’—নিজের অজানা দিক তুলে ধরলেন এমবাপ্পে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত অক্টোবর ২০, ২০২৬, ১৮:৩৩ অপরাহ্ণ
‘আমি বারবার প্রমাণ করেছি, বোকামিও করতে পারি’—নিজের অজানা দিক তুলে ধরলেন এমবাপ্পে

২০২৫-২৬ মৌসুমের সেরা ফুটবলার হিসেবে ‘ওঁজে দ’অর’ পুরস্কার জিতেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। পুরস্কার জয়ের পর এক সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, চাপ সামলানো, ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবনা এবং জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরাসি তারকা। সেখানে নিখুঁত মানুষ হওয়ার ধারণা ভেঙে দিয়ে অকপটে স্বীকার করেছেন, তিনিও ভুল করেন, কখনো কখনো বোকামিও করেন।

ফুটবল মাঠে অসাধারণ গতি, গোল করার দক্ষতা আর প্রবল আত্মবিশ্বাসের জন্য পরিচিত কিলিয়ান এমবাপ্পে। তবে মাঠের বাইরের মানুষটি কেমন, তা নিয়ে মানুষের ধারণা যে সব সময় বাস্তবের সঙ্গে মেলে না, সেই কথাই এবার সামনে এনেছেন ফরাসি এই ফরোয়ার্ড।

ফরাসি সাময়িকী ‘ওঁজে মঁদিয়াল’-এর দেওয়া ‘ওঁজে দ’অর’ পুরস্কার জিতেছেন এমবাপ্পে। ১৯৭৬ সাল থেকে পাঠকদের ভোটে মৌসুমের সেরা ফুটবলারকে এই পুরস্কার দিয়ে আসছে সাময়িকীটি। এবার এমবাপ্পে পেছনে ফেলেছেন জোয়াও নেভেস ও খভিচা কাভারাসখেলিয়াকে।

পুরস্কার পাওয়ার পর সাক্ষাৎকারে নিজের নিখুঁত ভাবমূর্তি নিয়ে মজার ছলে কথা বলেন এমবাপ্পে। তার ভাষায়, ‘যারা মনে করে আমি নিখুঁত, তারা নিশ্চয়ই টেলিভিশন দেখে না! আমি বারবার প্রমাণ করেছি, বোকামিও করতে পারি। আর এতে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমার মনে হয়, এটাও স্বাভাবিক।’

মানুষের কাছে তার যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, তা সব সময় বাস্তবের সঙ্গে মেলে না বলে মনে করেন এমবাপ্পে। টেলিভিশন বা পর্দার মাধ্যমে কাউকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এমবাপ্পে বলেন, ‘টেলিভিশনের মাধ্যমে কেউ আপনাকে সত্যিকার অর্থে চিনতে পারে না। এ কারণেই কখনো কখনো মানুষ এমন বিশ্লেষণ করে, যা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।’

বিষয়টি বোঝাতে অভিনয়শিল্পীর উদাহরণও দিয়েছেন তিনি। তার মতে, কোনো অভিনেতার শুধু সিনেমা দেখে তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা করলে বাস্তবের সঙ্গে সেই ধারণার বড় পার্থক্য থাকতে পারে। নিজেও পর্দার ওপাশে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন বলেই অন্যকে সহজে বিচার করতে চান না তিনি।

নিজেকে বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়ে এমবাপ্পে বরাবরই আত্মবিশ্বাসী। তবে তার এই মনোভাব ফ্রান্সে সব সময় ইতিবাচকভাবে গৃহীত হয় না। বিষয়টি তিনি বোঝেন বলেই জানিয়েছেন।

এমবাপ্পের ব্যাখ্যা, নিজের দেশটির ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তার ধারণা রয়েছে। ফলে নিজেকে সেরা বললে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে, সেটিও তার অজানা নয়। তবু নিজের বিশ্বাস থেকে সরে আসতে চান না তিনি।

‘আমি যখন বলি, আমি সেরা, তখন কথাটির কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা জানি। কিন্তু আমি এটা বলি, কারণ আমি তা বিশ্বাস করি এবং এটি আমাকে অনুপ্রাণিত করে। বড় কিছু অর্জন করতে চাইলে মাঠে নেমে এমন ভাবা যায় না যে অন্যরা আপনার চেয়ে ভালো। তা হলে নিজেকেই সীমাবদ্ধ করে ফেলা হবে,’- বলেন এমবাপ্পে।

নিজের আত্মবিশ্বাসকে তাই কেবল বড়াই হিসেবে দেখেন না এই তারকা। বরং নিজের লক্ষ্য পূরণে এটিকে প্রেরণা হিসেবে কাজে লাগাতে চান তিনি।

দীর্ঘদিন ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলে ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পেছনে আত্মবিশ্লেষণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এমবাপ্পে। তার মতে, নিজের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং ভুল খুঁজে বের করার মানসিকতা না থাকলে উন্নতি করা কঠিন।

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে একজন খেলোয়াড় হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হলে ভাবতে হবে, আত্মবিশ্লেষণ করতে হবে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নও তুলতে হবে। সন্দেহ খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি নিজেকে আরও উন্নত করতে সাহায্য করে। অতীতের সাফল্যে সন্তুষ্ট হয়ে থেমে থাকতে দেয় না।’

নিজের এক দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারকে ১০-এর মধ্যে ১০ দিয়েছেন এই ফরোয়ার্ড। তবে গোল কিংবা শিরোপার হিসাবকে সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন না তিনি। বরং ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ও প্রতিটি মৌসুমে নতুন করে নিজেকে মেলে ধরার আনন্দকেই বেশি গুরুত্ব দেন।

এমবাপ্পের ভাষায়, ‘গত ১০ বা ১১ বছরে আমি এমন একটি বছরও কাটাইনি, যখন ফুটবল খেলতে গিয়ে বিরক্ত হয়েছি। কখনো নিজের গতি কমিয়ে দিইনি।’

বিশ্বজুড়ে লাখো সমর্থকের প্রত্যাশা, সমালোচনা এবং প্রতিনিয়ত আলোচনার কেন্দ্রে থাকা এমন চাপ সামলানো সহজ নয়। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে এসব বিষয় ব্যক্তিগতভাবে নিতেন বলে স্বীকার করেছেন এমবাপ্পে।

তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে। এখন ২৭ বছর বয়সী এই ফুটবলার বুঝতে শিখেছেন, সবাই যে তার পারফরম্যান্স নিয়ে গঠনমূলক বিশ্লেষণ করবে, এমন নয়।

এমবাপ্পে বলেন, ‘বিষয়গুলো ব্যক্তিগতভাবে নিলে চাপ সামলানো কঠিন। ছোটবেলায় আমি সেভাবেই নিতাম। এখন আমার বয়স ২৭, আমি বিষয়গুলোকে কিছুটা দূর থেকে দেখতে পারি। বুঝি, কখনো কখনো মানুষ বিশ্লেষণ করার জন্য কথা বলে না এটাই বাস্তবতা।’

নিজের ব্যক্তিত্ব বোঝাতে এমবাপ্পে বলেন, তিনি পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। নিজেকে শুধু ‘গিরগিটির মতো’ বলার বদলে তিনি মনে করেন, তিনি ‘বিশ্বের সন্তান’—বিভিন্ন পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই তাঁর বৈশিষ্ট্য। বিশ্বের অসংখ্য তরুণ ফুটবলারের কাছে এমবাপ্পে অনুপ্রেরণার নাম। তবে যারা তার মতো হতে চায়, তাদের উদ্দেশে ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন এই ফরাসি তারকা।

তার মতে, কাউকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করা ভালো হলেও সেই ব্যক্তির মতো হওয়ার মধ্যেই স্বপ্নকে আটকে রাখা উচিত নয়। বরং নিজের সামর্থ্য দিয়ে আরও বড় কিছু অর্জনের স্বপ্ন দেখতে হবে।

এমবাপ্পে বলেন, ‘আমি সেই শিশুদের বলি, আমার মতো হতে চাওয়াটা নিজেদের জন্য একটি সীমা তৈরি করার মতো। স্বপ্ন দেখার উদ্দেশ্যই হলো কোনো সীমা না রাখা। তারা যদি আমার চেয়েও বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে, তাহলে নিজেদের আটকে রাখবে কেন?’

নিজের জীবনে আর কী পেলে আরও সুখী হবেন, এমন প্রশ্নে এমবাপ্পের উত্তর ছিল সরল, ‘আমি অবশ্যই একজন সুখী মানুষ। আমি সব সময় যে জীবন চেয়েছি, সেটিই পেয়েছি। ফুটবলার হতে চেয়েছিলাম, আর এখন প্রতি সপ্তাহে সেরা প্রতিযোগিতাগুলোতে খেলার স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে।’

এরপরই যোগ করেন, ‘আরও সুখী হতে আমার কী প্রয়োজন? কিছুই না। জীবনে আমি সব সময় আরও বেশি পাওয়ার চেষ্টা করি না। কাজের ক্ষেত্রে করি, কিন্তু জীবনে নয়। আপনার যা আছে, তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে জানতে হবে।’