সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আসছে নতুন নিয়ম, শিথিল হতে পারে যেসব বিধিনিষেধ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত অক্টোবর ১, ২০২৬, ২১:১৪ অপরাহ্ণ
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের ভ্রমণ ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে জারি করা বিধিনিষেধে বেশকিছু পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দা ছাড়াও পরিবেশবিদ ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনার করে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে এ বিষয়ে নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্বীপটিতে পর্যটকদের ভ্রমণে ১২টি নির্দেশনা জারি করা হয়। যার মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে দ্বীপটিতে পর্যটকদের যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখার পাশাপাশি শুধু ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাত্রিযাপনের অনুমতিসহ বেশকিছু নির্দেশনা ছিল। তবে নতুন নীতিমালায় পর্যটকদের রাত্রিযাপন ও ভ্রমণের সময়সীমায় পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানা গেছে।
দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। সেখানকার অপার সৌন্দর্য, পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্যের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিদিন দ্বীপটিতে কয়েক হাজার পর্যটকের সমাগম হয়। এর ফলে ছোট এই দ্বীপটিতে থাকার জন্য গড়ে ওঠে অসংখ্য হোটেল-রিসোর্ট। যেখানে ভ্রমণে আসা পর্যটকরা রাত্রিযাপন করতে পারেন। তবে দ্বীপের বাসিন্দাদের বাইরেও অনেকেই বাইরে থেকে ব্যবসায়িকভাবে বেশকিছু আবাসিক হোটেলও গড়ে তুলেছিলেন।
সবমিলিয়ে দ্বীপটিতে প্রায় দেড়শ’র মতো আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে বলে জানিয়েছেন সেন্টমার্টিন হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি এম এ আবদুর রহিম জিহাদী। যেখানে অন্তত ৫ হাজারের মতো পর্যটকের জন্য আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। তবে জীববৈচিত্র রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বিধিনিষেধের মধ্যে শুধুমাত্র ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসেই নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটকদের দ্বীপটিতে রাত্রিযাপনের সুযোগ দেয়া হয়। আর নভেম্বর মাসে শুধু দিনের বেলায় সেন্টমার্টিনে ঘোরার অনুমতি ছিল, কিন্তু রাতে দ্বীপটিতে অবস্থান করা যেত না।
তবে বিএনপি সরকার রাত্রিযাপন সংক্রান্ত এই বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, যে মানুষ ৬-৭ ঘণ্টা জার্নি করে দ্বীপটিতে যাচ্ছে, এরপর সেখানে ২-৩ ঘণ্টা থেকে আবারও ৬-৭ ঘণ্টা জার্নি করে কক্সবাজারে ফিরছে— এটি একেবারেই আনহেলদি প্র্যাকটিস।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমি ও আমাদের মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী (আব্দুল আউয়াল মিন্টু) এ বিষয়ে একমত হয়েছি। এটি নিয়ে সক্রিয় আলোচনা করা হচ্ছে, আগের নেয়া এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে আলোচনা চলছে। যে জার্নি করে যাবে, তাকে যদি আমরা রাত্রিযাপনের সুযোগ দেই সেটি ভালো হবে।
সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপনের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বিধিনিষেধে পরিবর্তন আনা উচিত বলে মনে করছে টুর অপারেটরদের সংগঠনও। বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রাফিউজ্জামান বলেন, রাত্রিযাপন নিয়ে নিষেধাজ্ঞায় পর্যটকরা মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহিত হয়েছে। কারণ, এত টাকা খরচ করে যখন একজন পর্যটক কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনে যাবে, নিশ্চয়ই তিনি দুই ঘণ্টার জন্য এত দূরের পথ পাড়ি দেবেন না। আমরা চাই এই সিদ্ধান্তে যেন পরিবর্তন আসে।
বাড়বে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সময়সীমা?
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১২ দফা বিধিনিষেধের আওতায় শুধুমাত্র ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে দ্বীপটিতে রাত্রিযাপনের সুযোগ রাখা হয়। সেই সঙ্গে কত সংখ্যক পর্যটক রাত্রিযাপন করতে পারবেন সেটিও নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে একদিনে কেবল ২ হাজার পর্যটকের রাত্রিযাপনের অনুমতি ছিল। ওই নিষেধাজ্ঞার কারণে এখনও সেন্টমার্টিনে নির্দিষ্ট সংখ্যার চেয়ে বেশি পর্যটক ভ্রমণের সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে সেন্টমার্টিনে শুধু দুই হাজার পর্যটক গিয়ে রাত্রিযাপন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে যারা সেন্টমার্টিনে যান তাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত পাস দেয়া হয়। যেহেতু, বিধিনিষেধে এখনও কোনো পরিবর্তন হয়নি, তাই নির্দিষ্ট ওই সংখ্যার বাইরে কোনো পর্যটক দ্বীপটিতে যেতে পারবেন না এবং সেখানে অবস্থান করতে পারবেন না।
তবে নতুন বিধিমালায় পর্যটকের সংখ্যা কিংবা ভ্রমণের সময়সীমা আরও বাড়ানো হবে কি না, সেই বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোন মাস থেকে কোন মাস পর্যন্ত ভ্রমণ করা যাবে, কত সংখ্যক পর্যটক ভ্রমণ করতে পারবেন, ব্যবসায়ীদের চাওয়া এবং পরিবশগত সীমাবদ্ধতাসহ সবকিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে শুনানি বা বৈঠক হবে, সেই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে একটি গাইডলাইন দেয়া হবে। যেখানে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি দ্বীপটিতে বসবাসরতদের স্বার্থও যেন রক্ষা হয়, সেই বিষয়গুলো আমরা বিবেচনা করবো।
কড়াকড়ি আসছে প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহারে
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বিধিনিষেধে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের ক্ষেত্রে আলোকসজ্জাসহ বারবিকিউ পার্টি না করা, রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টিও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এ ছাড়াও বিধিনিষেধের মধ্যে ছিল- দ্বীপটির কেয়াবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়-বিক্রয়, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও অন্যান্য জীব-বৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সেই সঙ্গে সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচল না করা।
এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র যাতে সুরক্ষিত হয়, সেই লক্ষ্যে আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি। সবার আগে এই দ্বীপটিকে সুরক্ষা করতে হবে। আমরা প্লাস্টিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেবো, যেন কোনো পর্যটক প্লাস্টিক বা সিঙ্গেল পলিথিন নিয়ে দ্বীপে ঢুকতে না পারে। এটিকে বাস্তবায়ন করতে পরিবেশসহ কোস্টগার্ডের লোক— সবাই দায়িত্ব পালন করবে। এগুলো চেক করে প্রতিটি জাহাজ ছাড়বে। কোনো পলিথিন বা প্লাস্টিক নিয়ে জাহাজে উঠতে পারবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।