এলজিইডির নথিতে সড়ক ‘পিছঢালা পাকা’, বাস্তবে ‘কাচা’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত অক্টোবর ৮, ২০২৬, ১২:১১ অপরাহ্ণ
এলজিইডির নথিতে সড়ক ‘পিছঢালা পাকা’, বাস্তবে ‘কাচা’

 

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বাশবাড়িয়া ইউনিয়নের ‘বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট সড়ক থেকে রকমান ব্যাপারী বাড়ি পযন্ত’ ১ কিলোমিটার পিছঢালা পাকা সড়ক নির্মাণে দুই বার বরাদ্দ দেওয়া হলেও সড়কটিতে কোনো কাজ হয়নি। এতে বছরের পর বছর ধরে কাদা মাটির খানাখন্দে ভরা সড়কে দুভোর্গের শিকার হচ্ছেন তিন গ্রামের হাজার হাজার মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের বরাদ্দের টাকা দিয়ে সাবেক এক বিচারপতিকে খুশি করতে তার আত্মীয় বাড়ির সড়ক পাকা করে দেয় উপজেলা এলজিইডির অসাধু কর্মকর্তারা। সরেজমিনে এমন অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়।

দশমিনা এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট সড়ক থেকে রকমান বেপারি বাড়ি পযন্ত ১ কিলোমিটার সড়ক এলজিইডির নথিতে ৫৭৮৫২৫১৩৩ নম্বর বিসি বা বিটুমিনাস কনক্রিট সড়ক। ২০১০-২০১১ অর্থ বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটি পাকাকরণ হয়। গত অর্থ বছরে গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও সেতু সংরক্ষণ ও সংস্কার (জিওবি-এম) প্রকল্পের আওতায় সড়কটি সংস্কারের জন্য ৩৩ লক্ষ্য ৮ হাজার ৮শ ৮৫ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দরপত্র পক্রিয়ায় কাজটি পায় মের্সাস একতা এন্টার প্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চলতি বছরের ২৩ মার্চ সংস্কার কাজ শেষ করেন ঠিকাদার। গত ২৭ এপ্রিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করেন এলজিইডি। সড়ক সংস্কার কাজের তদারকির দায়িত্বে ছিলেন দশমিনা উপজেলা এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. লুৎফর রহমান। তবে বাস্তবে নতুন নির্মাণ কিংবা সংস্কার কাজ কোনোটাই হয়নি অনুমোদিত প্রকল্পের সড়কে। সড়কটি এখনো কাদা মাটির কাচা সড়ক।

স্থানীয়রা জানান,‘ ৪০ বছর ধরে সড়কটি কাচা। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সহ হাজার হাজার মানুষ চলাচল করেন। খানাখন্দে ভরা সড়কে কোনো যানবাহন চলাচল করে না। বর্ষা মৌসুমে হাটু সমান কাদা থাকে। বিকল্প পথ না থাকায় এই সড়ক দিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হন পথচারীরা। দুভোর্গ লাঘব করার জন্য এলজিইডি সহ বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে সড়কটি পাকাকরণ প্রকল্প পাশ করিয়ে আনেন। দুবার বরাদ্দ দেওয়া হলেও সড়কটি কোনো কাজ হয়নি।

অনুসন্ধাননে জানা যায়, বাশঁবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রকমান ব্যাপারী বাড়ি পযন্ত ১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের বরাদ্দের একই ইউনিয়নে চাঁনমিয়া সিকদার সড়ক নামে ১ কিলোমিটার পিছঢালা পাকা সড়ক নির্মাণ করেন দশমিনা এলজিইডি। যদিও ওই সড়কটির কোনো অনুমোদন বা আইডি নম্বর নেই। চাঁনমিয়া সিকদার সাবেক এক বিচারপতির আত্মীয় হন। ওই বিচারপতিকে খুশি করতে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে অন্য সড়কের বরাদ্দের টাকায় বিচারপতির আত্মীয় বাড়ির সামনে সড়কটি নির্মাণ করেন দশমিনা এলজিইডি। ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে বাঁশবাড়িয়া লঞ্চঘাট থেকে রকমান ব্যাপারী বাড়ির পযন্ত সড়কের সংস্কার কাজে ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলে সেই বরাদ্দের টাকা আবারও বিচারপতির আত্মীয় বাড়ির সড়কটি সংস্কার করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. আনিস খান, জাহাঙ্গীর হোসেন, মহিবুল খান ও ফোরকান দালাল বলেন,‘ ৪০ বছর ধরে সড়কটিতে কোনো উন্নয়ন কাজ হয়নি। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করে প্রকল্প পাশ করিয়ে এনেছিলাম। তবে দশমিনা এলজিইডির ইঞ্জিনিয়ারেরা অবৈধ সুবিধা নিয়ে সাবেক বিচারপতি জহিরুল ইসলামের আত্মীয়ের বাড়ির সামনে সড়কটি নির্মাণ করেন। এবছর আবার সংস্কার কাজ পাশ হয়, সেটিও চান মিয়ার বাড়ির সড়কে কাজ করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজ তদারকের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী লুৎফর রহমান, সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী মহকুল হোসেন ও হিসাবরক্ষক মো. চানমিয়া অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে একটি অনুমোদিত সড়কের বরাদ্দের টাকায় অনুমোদনহীন একটি সড়কের সংস্কার কাজ করেন।

সংস্কারের কাজের ঠিকাদার মো. মাসুদ রানা বলেন, টেন্ডারে অংশ নিয়ে কাজটি পাই। পরে এসও ও উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার যে সড়কটিতে সংস্কার কাজ করতে বলছেন, সেই সড়কটিতেই শিডিউল অনুযায়ী কাজ করেছি। শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন করে চূড়ান্ত বিল উত্তোলন করেছি।

এবিষয়ে জানতে চাইলে সড়কের তদারক কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান বলেন, কারো কাছ থেকে কোনো অবৈধ সুবিধা নেইনি। ২০১০- ২০১১ অর্থ বছরে যে সড়কটি কাজ হয়েছে, আমি সেই সড়কটিতেই কাজ করেছি। একটি সড়কের বরাদ্দের টাকা দিয়ে আরেকটি সড়ক নির্মাণ করার নিয়ম আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘ ভুলতো আগেই হয়েছে, আমার কিছু করার নাই।’

সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী মকবুল হোসেন ও হিসাবরক্ষক মো. চাঁন মিয়া অন্যত্র বদলি হয়ে যাওয়ায় তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বতর্মান উপজেলা প্রকৌশলী এটিএম সাদিকুর রহমান বলেন,‘ একটি প্রকল্পে নামে বরাদ্দ হওয়া অর্থ দিয়ে আইডিবিহীন আরেকটি সড়ক নির্মাণ কিংবা সংস্কার কাজ করার সুযোগ নেই। যেহেতু কাজিটি আমার যোগদানের আগে হয়েছে, তাই বিস্তারিত বলতে পারছি না। এবিষয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে বিষয়টি উধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো।

এবিষয়ে পটুয়াখালী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ওয়ালিয়ার রহমানের সরকারি মুঠোফোন নম্বরে (০১৭০৮-১২৩২২৯) একাধিক বার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভি করেনি। খুদে বার্তা পাঠালো কোনো উত্তর দেয়নি।