

এইচ কে রোকন ॥
বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের গৌরনদী হাইওয়ে অংশে কমছে না সড়ক দুর্ঘটনা। বেড়েছে প্রাণহানির ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় প্রতিদিনই পঙ্গুত্ববরণ করতে হচ্ছে যাত্রীদের।
ঈদুল আজহার দিন ৭ জুন থেকে শুরু করে রোববার (১৫ জুন) পর্যন্ত এই মহাসড়কটিতে নয়দিনে ৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে তিনজন নিহতসহ কমপক্ষে অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গৌরনদী হাইওয়ে থানার ওসি আমিনুর রহমান।
তিনি জানান, মহাসড়কটি সরু, বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত রয়েছে। পাশাপাশি অদক্ষ চালক, অধিক গতি, বেপরোয়া চালনা, দূরপাল্লার পরিবহনের সঙ্গে থ্রি-হুইলারের পাল্লা দেওয়া এ সড়কে দুর্ঘটনার কারণ।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক। এতে সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়ে দুর্ঘটনা বাড়ছে। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ সব ক্ষেত্রে রয়েছে ত্রুটি আর গাফিলতি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকেই বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা আগের চেয়ে কমপক্ষে পাঁচ গুণ বেড়েছে। তবে মহাসড়ক রয়ে গেছে সেই আগের সরু। মহাসড়কটির ভুরঘাটা থেকে বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার সড়কের প্রায় ৩০টি স্থানে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।
তারা জানান, মহাসকড়টির ভুরঘাটা, ইল্লা, বার্থী, তারাকুপি, কটকস্থল, সাউদেরখাল পাড়, নীলখোলা, টরকি, গয়নাহাট, গৌরনদী, মাহিলারা, বাটাজোর, সানুহার, জয়শ্রী, ইচলাদী, শিকারপুর দোয়ারিকা টোল প্লাজা, নতুনহাট রহমতপুর ব্রিজ, সোনার বাংলা স্কুল মোড়, মেজর এম এ জলিল সেতুর ঢালের মোড়, রাকুদিয়া নতুন হাট মোড়, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন সেতুসংলগ্ন মোড় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব স্থানে প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, এই এলাকার প্রশস্ত ও মসৃণ সড়ক অতিক্রমের সময় যানবাহনগুলোর গতিসীমা সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার লেখা থাকলেও চালকেরা তা মানছেন না। দেখা যায়, এই অংশ অতিক্রমের সময় সব ধরনের যানবাহনের গতিসীমা প্রায় ৮০ কিলোমিটারের ওপরে থাকে।
গাছের ঘন সারির কারণে সড়কের মোড়ে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন দেখা যায় না। অনেক সময় দ্রুতগতিতে মোড় নিতে গিয়েও দুর্ঘটনা ঘটছে।
বরিশাল-ঢাকা রুটের বাসচালক মিজানুর রহমান জানান, পদ্মা সেতু চালুর উদ্বোধনের পর ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে পণ্য ও যাত্রীবাহী যানবাহনের চাপ অনেকটাই বেড়ে গেছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নছিমন, টমটম, থ্রি-হুইলারের মতো অবৈধ যানবাহনের।
আরেক যাত্রী লিটন মিয়া বলেন, দ্রুতগামী যানবাহনের সামনে থ্রি-হুইলারের মতো অবৈধ যানবাহগুলো থাকলে তাহলে বিপরীত পাশের সড়ক খালি না থাকলে দীর্ঘসময়েও ওভারটেক করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে ওভারটেক করতে হয় চালকের নিজের ঝুঁকিতে। হিসাবে কোনো গরমিল হলেই ঘটে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
পুলিশ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত ১৫ জুন রোববার বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের ভুরঘাটা এলাকায় হানিফ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে জাহিদ হাসান (২৯) নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী মারা যান।
এর আগে শুক্রবার (১৩ জুন) উজিরপুর উপজেলার ইচলাদী-ডাকবাংলো সড়কের ব্রাক কার্যালয়ের সামনে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাস্তা পারাপারের সময় অটোরিকশার ধাক্কায় আলতাফ সরদার (৫৩) নামের এক পথচারী নিহত হন। শনিবার (৭ জুন) রাত ১১টার দিকে উজিরপুর উপজেলার জয়শ্রী এলাকায় বাসচাপায় জুয়েল হাওলাদার (২২) নামে এক কলেজছাত্র নিহত হয়েছেন।
এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন হৃদয় দাস নামে তার এক বন্ধু। এদিকে রোববার (৮ জুন) রাত সাড়ে ৯টার দিকে গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া বাজার সংলগ্ন মহাসড়কে যাত্রীবাহী চার বাসের সংঘর্ষে ৩০ যাত্রী আহত হয়।
বিআরটিএ বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, মূলত সরু রাস্তা হওয়ায় এ মহাসড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে। রাস্তা প্রশস্ত হলে দুর্ঘটনা কমবে বলে জানান তিনি। মোবাইল কোর্ট বসিয়ে কাগজপত্র পরীক্ষা করা এবং সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে আসছে বিআরটিএ।
হাইওয়ে থানার ওসি আমিনুর রহমান বলেন, চালকদের গতি নিয়ন্ত্রণে রেখে যানবাহন চালাতে হবে। এ জোনের আওতায় সড়ক আইনে চেকপোস্ট বসিয়ে লাইসেন্স পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর মধ্যে অধিক গতি, ফিটনেস না থাকা, কালো ধোঁয়া, কাগজপত্র না থাকাসহ বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে। তবে চালকরা সচেতন না হলে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হবে না।