৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ দুপুর ১২:৪৪

উজিরপুরের সাতলায় গেট বসিয়ে চলাচল বন্ধ, স্কুলগামী শিক্ষার্থীসহ শতশত স্থানীয়দের ভোগান্তি

রিপোর্টার নামঃ
  • আপডেট সময় শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬
  • ৯ সংবাদটি পঠিত
উজিরপুর প্রতিনিধিঃ বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এমন এক দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, যা স্থানীয়দের ভাষায় “নিজ গ্রামেই বন্দি জীবন”। চলাচলের স্বাভাবিক পথ নিয়ে বিরোধের জেরে পুরো এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক এবং গভীর উদ্বেগ। প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ, চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষিকাজ, সামাজিক যোগাযোগ-সবকিছুই যেন এক অদৃশ্য বাধার মুখে থমকে গেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, সাগর এগ্রো ফার্ম-এর মালিক সাগর হোসেন, জাহিদ রানা এবং অত্র ফার্মের ম্যানেজার হৃদয়ের প্রভাব ও আচরণের কারণে তারা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে আছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা নিজেদেরকে যেন কোনো দূরবর্তী দ্বীপে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাসকারী মানুষ বলে অনুভব করেন। দিনের পর দিন এই অনিশ্চয়তা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা যায় অসুস্থ রোগীদের ক্ষেত্রে। এলাকাবাসী জানান, গভীর রাতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিকল্প পথ ব্যবহার করতে গিয়ে সময় নষ্ট হয়, যা রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় বিলম্বের আশঙ্কা পুরো এলাকাজুড়ে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগও হৃদয়বিদারক। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, শিবপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় মোট তিনটি গেট স্থাপন করে রাত ৮টা থেকে সকাল ৯:৩০ পর্যন্ত তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে এবং সাগর এগ্রো ফার্ম এর গেইট দুটি সার্বক্ষণিক বন্ধ থাকে। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন অনেক দূর ঘুরে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। যে পথ অতিক্রম করতে আগে ১৫ মিনিট সময় লাগত, এখন সেখানে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর্যন্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো ক্লাসে পৌঁছাতে পারে না এবং তাদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষের জন্য যাতায়াতের সংকট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি মৌসুমে ধান কাটার মেশিন এলাকায় প্রবেশ করতে না দেওয়ার কারণে স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী প্রায় দুইশত মণ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এই ক্ষতির ফলে অনেক কৃষক ঋণের বোঝা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। বহু পরিবারের বছরের প্রধান আয়ের উৎস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুধু ধান নয়, কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার, বীজ, কীটনাশক, মাছের খাদ্য এবং অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহনেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের বাধা। মৎস্যচাষী ও কৃষকেরা জানান, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে এবং সময়মতো উপকরণ না পৌঁছানোর কারণে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এতে কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন শিবপুর ৩নং ওয়ার্ডের সর্বস্তরের মানুষ। এলাকাবাসী একযোগে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং দ্রুত সমাধানের দাবি তুলেছেন। শিবপুর ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষে বক্তব্য দেন। একইভাবে সাতলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মেজবাহ উদ্দিনও জোরালো বক্তব্যে বলেন, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করা এখন জরুরি প্রয়োজন।
সরেজমিনে উপস্থিত সাংবাদিকরা এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখেছেন, চলাচলের পথের প্রতিবন্ধকতা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কতটা দুর্বিষহ করে তুলেছে। শিশুদের স্কুলে যেতে কষ্ট, রোগীদের চিকিৎসা সংকট, কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি এবং সাধারণ মানুষের অবিরাম ভোগান্তি পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করে তোলে। অনেক বাসিন্দা জানান, তারা এই সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে শঙ্কিত।
এখন শিবপুরবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা-প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ। তাদের বিশ্বাস, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হলে শতাধিক পরিবার আবার স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবনযাত্রায় ফিরতে পারবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও সামাজিক জীবনকে বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন ...

এই বিভাগের আরো খবর...
© All rights Reserved © 2025 Rising Barisal
Developed By Engineerbd.net
EngineerBD-Jowfhowo