৩১শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ রাত ৩:৫২

নদীর ছাড়পত্রে সাগর থেকে কৌশলে ইলিশ পাচার

রিপোর্টার নামঃ
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬
  • ৯ সংবাদটি পঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: ভোলায় নদীর ছাড়পত্র দিয়ে কৌশলে নিষিদ্ধ সাগরের কোটি কোটি টাকার ইলিশ পাচার হচ্ছে। মৎস্য বিভাগ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই ইলিশ পাচার বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

অভিযান শুরুর আগেই খবর ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। এতে করে পাচারকারীরা ইলিশ বোঝাই ট্রলার নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছেন। অনেক সময় সাগরের ইলিশকে নদীর ইলিশ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মৎস্য কর্মকর্তারাও পাচারকারীদের কৌশলের সঙ্গে পেরে উঠছেন না।

সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ৪৭৫ প্রজাতির মাছের অবাধ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ১৫ এপ্রিল থেকে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। আগামী ১১ জুন পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্রকৃত জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে নামতে পারছেন না। সাগরের এই নিষেধাজ্ঞা তাদের জন্য যখন জীবিকার চরম সংকট তৈরি করেছে, ঠিক তখনই ভোলার প্রভাবশালী ইলিশ সিন্ডিকেটের কাছে তা যেন আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুযোগটাকে কাজে লাগাচ্ছে প্রভাবশালী ইলিশ সিন্ডিকেট।

Google News গুগল নিউজে প্রতিদিনের বাংলাদেশ”র খবর পড়তে ফলো করুন

জানা গেছে, ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ আহরণে আইনি বাধা নেই। তাই উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর থেকে পাচারকারীরা নদীতে মাছ ধরার ছাড়পত্র নিচ্ছেন। কিন্তু তারা আসলে নদীতে মাছ ধরছেন না। তারা মাছ ধরছেন সমুদ্রে। আর কোটি কোটি টাকার সেই মাছ নদীর মাছের বৈধ পরিবহন ছাড়পত্রকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ঘাট থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করছেন। ফলে নদীর বৈধতা এখন সাগরের নিষিদ্ধ বাণিজ্যের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

এই সুকৌশলী কারসাজির একটি বড় প্রমাণ মেলে গত ১২ মে রাতে। ভোলা সদর উপজেলার পানপট্টি বাজারে তিনটি ট্রাকভর্তি প্রায় ১ কোটি ১ লাখ টাকা মূল্যের ইলিশ জব্দ করে কোস্ট গার্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। সেই অভিযানে জব্দ করা ইলিশকে ব্যবসায়ীরা নদীর মাছ বলে দাবি করলেও সেগুলো ছিল আসলে সমুদ্রের ইলিশ। সদর উপজেলার অভিযানে মাছগুলোকে নিষিদ্ধ সাগরের বলে জব্দ করা হলেও সেই একই চালানের অনুকূলে চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য দপ্তর থেকে বৈধ ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল।

বর্তমানে নদ-নদী মাছ ধরার জন্য উন্মুক্ত থাকায় পাচারকারী চক্রটি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে মৎস্য দপ্তর থেকে নিয়মিত নদীর মাছ পরিবহনের ছাড়পত্র সংগ্রহ করছেন। আর এই ছাড়পত্র দিয়েই সামরাজ ঘাটে আসা নিষিদ্ধ সামুদ্রিক ইলিশগুলো ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে। পথিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জেরার মুখে পড়লে তারা এই নদীর মাছের চালানপত্র প্রদর্শন করে পার পেয়ে যাচ্ছে।

গত ১৪ মে দুপুরে সামরাজ মৎস্যঘাটে সরেজমিন মৎস্য কর্মকর্তার অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই ঘাটের আড়তদারদের মধ্যে এক বিস্ময়কর চতুরতা ও তৎপরতা দেখা যায়। সাগরের ইলিশগুলো তড়িঘড়ি করে বরফের স্তূপের নিচে চাপা দিয়ে সেগুলোকে নদীর মাছ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

অভিযানের সময় ঘাটের আড়তদাররা তাদের কোনো ট্রলার সাগরে যায়নি বলে দাবি করলেও নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জেলে স্বীকার করেন যে, তারা ১৩ দিন পর সাগর থেকে প্রায় ৮-১০ লাখ টাকার মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরেছেন। তবে প্রশাসনের ভয়ে ট্রলার ঘাটে ভেড়েনি।

এদিকে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা ও শিথিলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মৎস্য কর্মকর্তারা ঘাটে পৌঁছানোর আগেই অভিযানের তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। খবর পেয়ে ইলিশবোঝাই সমুদ্রগামী বড় বড় ট্রলার দ্রুত ঘাট ত্যাগ করে নিরাপদ দূরত্বে নোঙর করে।

চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু জানান, মৎস্যঘাটে স্তূপকৃত ইলিশ দেখে সেগুলোর উৎস (সাগর নাকি নদী) নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করার কোনো উপায় নেই। একই কথা বলেছেন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন। তিনি বলেন, ঘাট বা বাজারে থাকা মাছটি সাগর নাকি নদীর ইলিশ, তা কেবল চোখের দেখায় নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।

অভিযানের পরেও সামরাজ মৎস্যঘাটের চিত্র পাল্টায়নি। সেখানে এখনও প্রকাশ্যে সামুদ্রিক ইলিশ বিক্রি ও পাচার অব্যাহত রয়েছে। এ নিয়ে একধরনের চোর-পুলিশ খেলা চলছে। আর এই খেলায় প্রকৃত ও ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভবান হচ্ছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন ...

এই বিভাগের আরো খবর...
© All rights Reserved © 2025 Rising Barisal
Developed By Engineerbd.net
EngineerBD-Jowfhowo